Spread the love

দেশের নদ-নদী এবং বঙ্গোপসাগরে ভরা মৌসুমেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। জেলেদের জালে ইলিশ না পড়ায় উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে হাহাকার তৈরি হয়েছে। গবেষক, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মতে, এই সংকটের পেছনে কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, বরং মানুষের তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী। মূলত তিনটি প্রধান কারণে দেশের মৎস্য ভাণ্ডার এখন ইলিশ শূন্য হয়ে পড়ছে: নদীর বুকে জেগে ওঠা ডুবোচর, মোহনায় ‘গোপ জাল’ (কারেন্ট বা বেহুন্দি জালের বিশেষ রূপ) দিয়ে জাটকা নিধন এবং জলবায়ুর চরম ভাবাপন্ন আচরণ।

ডুবোচরের বিস্তার: পরিযায়নে বড় বাধা

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ একটি পরিযায়ী  মাছ। প্রজনন ও ডিম ছাড়ার জন্য এরা সমুদ্রের লোনা পানি থেকে নদীর মিষ্টি পানিতে ছুটে আসে। কিন্তু গত কয়েক দশকে দেশের প্রধান প্রধান নদী ও মোহনাগুলোতে পলি জমে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে।

নদীর গভীরতা বা নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানির স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ইলিশ সাধারণত তীব্র স্রোত ও গভীর পানি পছন্দ করে। ডুবোচরের কারণে নদীর প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে ইলিশ আর নদীতে ঢুকতে পারছে না। ফলে নদীর ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

 মোহনায় গোপ জাল: জাটকা নিধনের মহোৎসব

আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও একশ্রেণীর অসাধু চক্র নদীর মোহনা এবং ইলিশের চলাচল পথে ‘গোপ জাল’ বা ঘন ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল পেতে রাখছে। এই জালগুলো পানির নিচে এমনভাবে পাতা হয় যা দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডিম ফুটে বের হওয়া ইলিশের বাচ্চা বা জাটকা যখন সমুদ্রের দিকে যেতে চায়, তখন এই মোহনাগুলো পার হওয়ার সময় লাখ লাখ জাটকা এই গোপ জালে আটকে মারা পড়ে। প্রজনন মৌসুমের পরপরই এভাবে নির্বিচারে শিশু ইলিশ নিধন করার ফলে সাগরে গিয়ে বড় হওয়ার মতো ইলিশের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমে যাচ্ছে। বর্তমান ইলিশ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ এটি।

জলবায়ু পরিবর্তন ঋতুচক্রের বিপর্যয়

 

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ইলিশের জীবনচক্রে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে বৃষ্টিপাতের সময়সূচি বদলে গেছে। ইলিশের নদীতে আসার অন্যতম প্রধান উদ্দীপক হলো সময়মতো প্রচুর বৃষ্টিপাত ও পানির সঠিক তাপমাত্রা।

 

অনাবৃষ্টি ও তীব্র গরমের কারণে ইলিশের প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাগরে পানির গভীরতা ও স্রোতের যে স্বাভাবিক চরিত্র ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা ওলটপালট হয়ে গেছে। ফলে গভীর সাগরের মাছ গভীরেই রয়ে যাচ্ছে, উপকূলের কাছাকাছি বা জেলেদের জাল ফেলার সীমানার মধ্যে তারা আসছে না।

 

 

 

সংকটে লাখো জেলে পরিবার

 

সাগর ও নদীতে ইলিশ না পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ জেলে পরিবার এখন চরম ঋণের জালে জর্জরিত। ট্রলারের জ্বালানি খরচ ও জেলের খোরাকি তুলতে না পেরে অনেক বোট মালিক ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। সরকারি সহায়তার আওতা বাড়ানো এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এই সংকট উপকূলীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

 

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাট। সাধারণত বছরের এই সময়ে এখানে ইলিশ কেনাবেচার ধুম ও পাইকারদের হাঁকডাকে কান পাতা দায় হতো। কিন্তু এখন সেখানে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘাটে সারি সারি ফিশিং ট্রলার নোঙর করা থাকলেও নেই কোনো কোলাহল। ভরা মৌসুমেও বিষখালী, বলেশ্বর নদী ও গভীর বঙ্গোপসাগরে ইলিশ না পাওয়ায় খাঁ খাঁ করছে পুরো বন্দর। জলবায়ু পরিবর্তন, বিষখালী-বলেশ্বর নদীর মোহনায় ডুবোচরের বিস্তার এবং নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে বরগুনার মৎস্য অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে।

ডুবোচরের ফাঁদে বিষখালী বলেশ্বর নদী

বরগুনার প্রধান দুই নদী বিষখালী ও বলেশ্বর। পূর্বে এই নদীগুলোতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী দুটির মোহনায় ও চরাঞ্চলে বিশাল বিশাল ডুবোচর জেগে ওঠায় পানির গভীরতা কমে গেছে। ফলে সমুদ্র থেকে নদীর মিষ্টি পানিতে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশের ঝাঁক পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। বিষখালী নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরের কারণে মাছের পরিযায়ন (Migration) পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জেলেদের জালে।

 ট্রিপ প্রতি লাখ টাকার লোকসান জলবায়ুর প্রভাব

গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া একেকটি ট্রলারে ১৫ থেকে ২৫ জন মাঝি-মাল্লা থাকেন। বরফ, জ্বালানি তেল ও রসদসহ একেকটি ট্রিপে খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। কিন্তু জেলেরা ১০-১২ দিন সাগরে থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মাছ নিয়ে ফিরছেন।

এর ওপর যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা। বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অসময়ের বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ গভীর সমুদ্রের তলদেশে চলে যাচ্ছে, যা সাধারণ জেলেদের জালের নাগালের বাইরে

 

 

অনাবৃষ্টি ও তীব্র গরমের কারণে ইলিশের প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাগরে পানির গভীরতা ও স্রোতের যে স্বাভাবিক চরিত্র ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা ওলটপালট হয়ে গেছে। ফলে গভীর সাগরের মাছ গভীরেই রয়ে যাচ্ছে, উপকূলের কাছাকাছি বা জেলেদের জাল ফেলার সীমানার মধ্যে তারা আসছে না।

 

 

 

মৎস্যজীবীরা যা বলেন

বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানান, সাগরে ও নদীতে মাছ না থাকায় বরগুনা সদর, আমতলী ও পাথরঘাটার প্রায় ৮০ হাজার নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত জেলে পরিবার এখন দাদন এবং এনজিওর ঋণের ঋণের জালে জর্জরিত।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “নিষেধাজ্ঞার পর জেলেরা বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিল, কিন্তু মাছের দেখা নেই। একদিকে জ্বালানি ও সরঞ্জামের চড়া দাম, অন্যদিকে ছোট ফাঁসের অবৈধ জাল দিয়ে জাটকা নিধন—এই দুই কারণে সাগরে ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। দ্রুত মোহনা ড্রেজিং ও অবৈধ জাল বন্ধ না করলে বরগুনার মৎস্য শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”