Spread the love

 

 

ফসলের বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে একসময় বিচরণ ছিলো যে পতঙ্গগুলোর এখন তারা যেন হাওয়া হয়ে গেছে। একসময় সকালে বিকেলে নানা রঙের ফড়িং , ভ্রমর আর আর মৌমাছি ঘুরে বেড়াতো এ ফুল থেকে ও ফুলে। শিশুরা এক-একটি ফড়িংয়ের পেছনে সারাদিন পার করে দিতো। গ্রামবাংলায় এই দৃশ্যটি এখন বিরল। এগুলো কেবল দেখার জন্য সৌন্দর্য নয়, কৃষির অত্যন্ত উপকারী পতঙ্গ। কারণ এই পতঙ্গগুলো এক ফুল থেকে আরেক ফুলে য্ওায়ার সময় ঠোঁটে পাযে ডানায় ফুলের রেনু মেখে নিয়ে যায়। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে পরাগায়ন ঘটায়।

মাঠের বাস্তবতামানুষ যখন মৌমাছি

ফরিদপুরের পেঁয়াজ বীজ চাষী কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাউ-কুমড়ো চাষীদের মাঠগুলোতে এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। কাকডাকা ভোরে কৃষকেরা লাঠি বা তুলি হাতে ফুল থেকে ফুলে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মৌমাছি বা প্রজাপতির যে কাজটি প্রাকৃতিকভাবে করার কথা ছিল, তা এখন করতে হচ্ছে মানুষের হাত দিয়ে (Hand Pollination)।

প্রকৃতির নিখরচায় করে দেওয়া এই পরাগায়ন এখন কৃষকের জন্য এক বিশাল বাড়তি শ্রম ও ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, যার চূড়ান্ত দায় গিয়ে ঠেকছে সাধারণ ভোক্তার পকেটে। সরিষা, তরমুজ, পিঁয়াজ বীজ থেকে শুরু করে হরেকরকমের পুষ্টিকর ফলমূল ও সবজির স্বাভাবিক ফলন আজ এই পতঙ্গ-সংকটের মুখে।

কেন এই নীরব বিলুপ্তি?

বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন সাইলেন্ট পলিনেশন ক্রাইসিস বা নীরব পরাগায়ন সংকট। এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল খলনায়ক তিনটি:

  • রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ফসলের সুরক্ষার নামে জমিতে যে তীব্র মাত্রার রাসায়নিক কীটনাশক (বিশেষ করে নিওনিকোটিনয়েড গ্রুপ) ছিটানো হচ্ছে, তা ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি বন্ধু-পোকা ও মৌমাছিদের স্নায়ুতন্ত্র অকেজো করে নিমেষেই মেরে ফেলছে।
  • আগাছানাশকের থাবা: মাঠের আইল বা রাস্তার ধারের বুনোফুল ও গুল্মলতা ধ্বংস করতে দেদারসে ব্যবহার হচ্ছে আগাছানাশক (হার্বিসাইড)। অথচ এই বুনোফুলগুলোই ছিল মৌমাছি আর ভ্রমরদের প্রধান খাদ্য ও আশ্রয়স্থল।
  • মশানিধনের ফগিং: কেবল গ্রামেই নয়, শহরাঞ্চলের আশপাশে মশা মারার জন্য পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া বা ফগিংয়ের কারণেও বিপুল পরিমাণ প্রজাপতি ও মৌমাছি প্রাণ হারাচ্ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, মানুষের খাওয়া প্রতি তিন লোকমা খাবারের এক লোকমাই আসে পরাগমিলনকারী পতঙ্গের কল্যাণে। ধান বা গমের মতো দানাদার ফসল বাতাসে পরাগায়িত হলেও, আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের জোগানদাতা ফল এবং সবজি সম্পূর্ণভাবে পতঙ্গ-নির্ভর।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ফসলি উদ্ভিদ এবং প্রায় ৯০ শতাংশ বুনো ফুল ফোটা উদ্ভিদ কোনো না কোনোভাবে পরাগায়নকারী প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। যদি এই মৌমাছি ও উপকারী পতঙ্গরা পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তবে ফসলের উৎপাদন কমবে তা-ই নয়; দেশজুড়ে দেখা দেবে তীব্র পুষ্টিহীনতা। ডাইনোসর বিলুপ্তির চেয়েও এই ক্ষুদ্র পতঙ্গদের হারিয়ে যাওয়া মানব অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

অদৃশ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি  বাস্তুতন্ত্রের সংকট

পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যাওয়ার প্রভাব কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও । কৃত্রিম পরাগায়নের কারণে চাষীদের যে অতিরিক্ত শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, বুনো উদ্ভিদের পরাগায়ন ব্যাহত হওয়ায় আমাদের প্রাকৃতিক বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্যও ভারসাম্য হারাচ্ছে। ক্ষুদ্র এই পতঙ্গগুলো খাদ্য শৃঙ্খলের (Food Chain) এমন এক ভিত্তি, যা ভেঙে পড়লে পুরো বাস্তুতন্ত্র ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

উত্তরণের পথ কোন দিকে?

এই সংকট থেকে বাঁচতে এখনই সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

  • জৈব বিকল্পের সম্প্রসারণ: রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে নিমতেল, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) বা জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
  • কীটনাশক প্রয়োগের সময় নির্বাচন: একান্তই যদি রাসায়নিক কীটনাশক দিতে হয়, তবে তা মৌমাছির মূল বিচরণের সময় এড়িয়ে খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় দেওয়া উচিত, যখন পতঙ্গদের আনাগোনা কম থাকে।
  • রিফিউজিয়া জোন‘ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি: মাঠের আইলে, বাগানের এক কোণে কিংবা সড়ক ও রেললাইনের ধারে কিছু দেশি বুনোফুল গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেওয়া, যা পতঙ্গদের জন্য ‘ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করবে।
  • নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ: পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং মৌমাছি-বিধ্বংসী ।

 

শাঁওলী সুমন