Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী | ৮ মে, ২০২৬

পটুয়াখালীতে টানা সাত দিনের অতিবৃষ্টিতে কৃষিখাতে নেমে এসেছে স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ বিপর্যয়। মুগডাল, চিনাবাদাম, কাঁচামরিচ, তিল ও গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির বিস্তীর্ণ ক্ষেত এখন পানির নিচে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার ৩০ হাজার ৬২৬ জন কৃষকের প্রায় ৯৯ কোটি ৫০ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে।

সরেজমিনে সদর উপজেলার বদরপুর ও গাবুয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে মাঠে সোনালী ফসলের হাসি থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু থৈ থৈ পানি। কোথাও মুগডালের গাছ পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, আবার কোথাও মাটির নিচেই নষ্ট হয়ে গেছে অপরিপক্ব চিনাবাদাম।

ক্ষতিগ্রস্ত কিষানি ফরিদা বেগম বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, “মুই ১৫ কড়া জমিতে মুগডাইল দেই। এই বৃষ্টির পানিতে তলাইয়্যা সব নষ্ট হইয়্যা গ্যাছে। এক ছটাক ডাইলও ঘরে তুলতে পারি নাই।” একই গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার তিন ভাগের দুই ভাগ ফসলই এখন পানির নিচে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত ২০৫.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জেলাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে:

জেলায় মোট আবাদি জমি ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৭৮ হেক্টর। তার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৬১ হাজার ৯৩৭ হেক্টর।বি আর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমির ফসল।

সরকারের হিসাবে মুগডালে সর্বোচ্চ ৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা; চিনাবাদামে ১০ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বোরো ধানে ৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মিষ্টি আলু ও শাক-সবজিতেও কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণকেও দায়ী করছেন স্থানীয় কৃষকরা। গাবুয়া গ্রামের কৃষক আউয়াল গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি খাল দখল কইরা ঘর বানাইছে। নাই কালভার্ট, নাই স্লুইসগেট। পানি নামার রাস্তা নাই।” অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি আটকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, যা ফসলের পচন ত্বরান্বিত করেছে।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, “টানা বৃষ্টিতে কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করছি। সরকারের কাছে দ্রুত প্রণোদনা ও সহায়তার সুপারিশ পাঠানো হবে যাতে কৃষকরা পুনরায় চাষাবাদ শুরু করতে পারেন।”

বর্তমানে পানি দ্রুত নেমে না গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই অংক আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় এখন দিশেহারা পটুয়াখালীর হাজারো কৃষক পরিবার।