Spread the love

নেত্রকোনার মানুষের কাছে বালিশ মিষ্টি কেবল একটি খাবার নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি ও ভালোবাসার এক প্রতিচ্ছবি। এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে ফেরে এক মজার ছড়া—

“জাম, রসগোল্লা পেয়ে শ্বশুর করলেন চটে নালিশ,

আশা ছিল আনবে জামাই গয়ানাথের বালিশ।”

বিয়েবাড়ি হোক কিংবা কোনো শুভ অনুষ্ঠান—জামাই আপ্যায়ন থেকে শুরু করে প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে বালিশ মিষ্টি না থাকলে যেন উৎসবের আনন্দই মাটি হয়ে যায়। গয়ানাথ ঘোষের সেই ছোট্ট দোকানটি আজ শতবর্ষ পেরিয়ে তার বংশধর ও দক্ষ কারিগরদের হাতের জাদুতে আগের মতোই জমজমাট।

বাঙালির উৎসব-আয়োজন মানেই হরেক রকমের মিষ্টির সুবাস। রসমালাই, চমচম, কালোজাম কিংবা সন্দেশের ভিড়ে মিষ্টির বাজারে এক অদ্ভুত নাম ‘বালিশ মিষ্টি’। নামটা শুনলেই প্রথমবার চোখ কপালে ওঠে সবার—বালিশ দিয়ে আবার মিষ্টি হয় নাকি! কিন্তু নেত্রকোনায় পা রেখে একবার এই রাজকীয় মিষ্টির স্বাদ নিলে সেই সংশয় তো দূর হয়ই, বরং মনের গভীরে এক চিরস্থায়ী ভালোলাগা তৈরি হয়।

যেভাবে শুরু

গল্পটা আজ থেকে প্রায় একশো বা তারও বেশি বছর আগের। নেত্রকোনা জেলা শহরের বারহাট্টা রোডের মিষ্টি কারিগর শ্রী গয়ানাথ ঘোষ। গতানুগতিক মিষ্টির বাইরে কিছু একটা করার জেদ থেকেই তিনি তৈরি করলেন বিশালাকার এক নতুন ধরনের মিষ্টি। দেখতে অবিকল ছোট কোলবালিশের মতো! দোকানে আসা ক্রেতারা সেই মিষ্টি মুখে দিয়ে যারপরনাই মুগ্ধ হলেন এবং নাম দিলেন ‘গয়ানাথের বালিশ’। সময়ের পরিক্রমায় আজ তা গোটা দেশের মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত ‘বালিশ মিষ্টি’ নামে।

 

 

 

সুনিপুণ কারিগরিতে তৈরি অমৃত

বাইরে থেকে বড়সড় মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নিখুঁত কারিগরি। খাঁটি গরুর দুধের তাজা ছানা, সামান্য ময়দা আর চিনির সুষম মিশ্রণে তৈরি হয় এর মূল মণ্ড। এরপর শিল্পীর হাতের জাদুতে কোলবালিশের রূপ দিয়ে সেগুলোকে ফোটানো হয় টগবগে চিনির রসে। দীর্ঘক্ষণ রসে ডুবিয়ে রাখার পর যখন মিষ্টিটি রসে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, তখন তার ওপর ঢেলে দেওয়া হয় ক্ষীর কিংবা দুধের ঘন মালাইয়ের পুরু প্রলেপ। ছোট সাইজ থেকে শুরু করে এক থেকে দুই কেজি ওজনের বিশালাকার বালিশও তৈরি হয় এখানে!

 

 

 

গৌরবের মুকুটে নতুন পলক: জিআই স্বীকৃতি

শতবর্ষের এই ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনন্য উচ্চতায় নিতে সম্প্রতি নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী ‘বালিশ মিষ্টি’ অর্জন করেছে মর্যাদাপূর্ণ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতি। এই গৌরবময় প্রাপ্তি কেবল নেত্রকোনাবাসীর বুককেই ফুলিয়ে দেয়নি, বরং মিষ্টির দুনিয়ায় বাঙালিকে এনে দিয়েছে এক অনন্য সম্মান।