Spread the love

 

রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ‘গোপালভোগ’ আম গাছ থেকে নামানোর সরকারি সময়সীমা উপেক্ষা করে অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই দেশের বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে এই ফল। আড়তের অন্দরমহলে চলছে জাগ দিয়ে আম পাকানোর মহোৎসব। তীব্র গরম আর অতি-মুনাফার লোভে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদার নির্ধারিত সময়ের তোয়াক্কা না করে অপরিপক্ক আম পেড়ে রাসায়নিকের মাধ্যমে তা পাকাচ্ছেন। আড়ালে চটের বস্তা আর কম্বলের নিচে কার্বাইডের প্রভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা এই আমগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তা আসলে বহন করছে নীরব বিষ।

সরেজমিনে রাজশাহীর অন্যতম প্রধান আম বিপণন কেন্দ্র শিরোইল এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, সেখানে শফিকুল ইসলামের আমের আড়তসহ একাধিক আড়তে কাকডাকা ভোর থেকেই চলছে ব্যস্ততা। খুচরা বিক্রেতারা ভ্যানে করে বিক্রির জন্য আম নিয়ে যাচ্ছেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এবং ট্রাকে করে তা চলে যাচ্ছে রাজধানীতে। বাইরে পরিচ্ছন্ন ও তাজা আম সাজিয়ে রাখা হলেও আড়তের অন্ধকার কোণে ক্যারেট ভর্তি আম ঢেকে রাখা হয়েছে মোটা চটের বস্তা, ত্রিপল ও কম্বল দিয়ে।

তদন্তকালে দেখা যায়, এই কম্বল ও বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখার (যা স্থানীয় ভাষায় ‘জাগ দেওয়া’ নামে পরিচিত) মূল উদ্দেশ্য হলো কেমিক্যালের প্রভাবকে তীব্র করা। বিষাক্ত কার্বাইড ও কৃত্রিম হরমোন স্প্রে করার কারণে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই উত্তাপের সৃষ্টি হয়, যা অপরিপক্ক সবুজ আমকে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে হলদেটে পাকা রঙে রূপান্তর করে। সাধারণ ক্রেতারা এই আকর্ষণীয় রঙ দেখেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

কৃত্রিম উপায়ে আম পাকানোর এই অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও ব্যবসায়ীদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বিষয়টিকে আবহাওয়াজনিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। শিরোইল এলাকার আম চাষী ও আড়তদার শফিকুল ইসলামের দাবি, তীব্র তাপদাহের কারণে গাছের সব আম না পাকলেও ওপরের অংশের আমগুলো সময়ের আগেই পেকে গেছে।

ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, “রাজশাহীর আমের সরকারি ডেট আছে ২২ তারিখে। তবে আমাদের কিছু কিছু বাগান কেনা আছে, সেক্ষেত্রে কিছু বড় গাছের, পুরাতন গাছের মাথার ওপরকার আম অলরেডি পেকে গেছে। সেজন্য মাথা থেকে আমরা কিছু কিছু আম ৮-১০ ক্যারেট করে ভাঙছি, বাগান ভেঙে আমরা এখানে বিক্রয় করতেছি।” তবে আড়তে জাগ দেওয়া এবং কার্বাইড ব্যবহারের সরাসরি অভিযোগের জবাবে তিনি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

বাজারে বর্তমানে ভালো মানের আম পাইকারি ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা মণ দরে এবং তুলনামূলক কম মানের আম ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। ঈদের পর আমের বাজার পুরোদমে জমবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। অধিক লাভের আশায় অনেকেই সরকারি নির্দেশনা মানার অপেক্ষা করতে রাজি নন। এছাড়া আমে সুন্দর রঙ আনা এবং পোকা দূর করার জন্য এক সপ্তাহ আগে একধরণের বিশেষ কীটনাশক স্প্রে করার কথাও চাষীরা স্বীকার করেন, যার সুনির্দিষ্ট নাম বা রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে সাধারণ চাষীদের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।

চাষী ও আড়তদারদের এই ‘গাছপাকা’ আমের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আম গবেষকেরা। আম গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, “গোপালভোগ আম ২৫ মে’র পর এবং হিমসাগর জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রাকৃতিকভাবে পাকা শুরু হবে। এর আগে বাজারে যে আম পাওয়া যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নিয়মে পাকেনি। অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় অপরিপক্ক আম পেড়ে কার্বাইডে পাকানো হচ্ছে। এগুলো খেলে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। ভোক্তারা বেশি টাকা দিয়ে আম কিনলেও এর আসল স্বাদ ও পুষ্টিগুণ পাবেন না, বরং প্রতারিত হবেন।”

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই কেমিক্যালযুক্ত আম নিয়মিত খেলে মানুষের পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভার ও কিডনি বিকল করে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতীদের জন্য এই আম বিষেরই শামিল। কৃত্রিমভাবে পাকানো আম চেনার উপায় হলো— এগুলোর রঙ সর্বত্র সমানভাবে হলুদ হয়, কিন্তু বোঁটার অংশটি অনেক সময় সবুজ থেকে যায় এবং প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের মতো কোনো সুমিষ্ট গন্ধ থাকে না।

রাজশাহীর আমের গুণগত মান ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি বছরই স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং অংশীজনদের সমন্বয়ে ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম নামানোর নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। তবে এবার এই নিয়ম বা ক্যালেন্ডার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে শুরুতেই বড় ধরণের গলদ দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের সাথে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই বাজারে আম নামিয়ে দিয়েছেন।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমের একটা ক্যালেন্ডার তৈরি হয় সবার সম্মতিতে। এইবার ব্যবসায়ীগণ আসলে আমের এই ক্যালেন্ডার সম্মতির জন্য আমাদের কাছে আসে নাই। তারপরও অপরিপক্ক আম যদি বাজারে আসে বা যদি কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হয়, আমাদের মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত রয়েছে। আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অনুরোধ করব যেন বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করা হয় এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

শাওলি সুমন