
বহুবছর আগে ফুটপাতে শ্রমজীবী মানুষের খাবার দোকানগুলোকে অনেকেই ডাকতেন “ ইটালি হোটেল “ নামে। সত্যিই অনেকগুলোতেই ইটের ওপর চাপানো কাঠের তক্ততায় বসেন খেতেন স্বল্প আয়ের মানুষরা। ছাত্র অবস্থায় আমরাও অনেকে খেয়েছি ইটালি হোটেলে,পকেটে পয়সা নাই অথবা বন্ধু-বান্ধব মিলে হৈ-হুলোড় করেও খেতাম গোটা মাছের মাথা বা ইলিশ মাছের ডিম আর কাচঁকি মাছ আলু দিয়ে,হলুদ ঝোলের সাথে খালার বেড়ে দেয়া গরম ভাত। আহা সাথে কাঁচামরিচ আর পেয়াঁজ । দিন বদলেছে তেমন ভাতের হোটেল এখনো আছে কিন্তু হালজমানায় তার বাহারি নাম স্ট্রিটফুড । রাজধানীর আগাঁরগাওয়ে তো কাঠের চুলায় পিজ্জাও বানানো হয় , লাইন দিয়ে বসে কেক বা নুডল,কাবাবের দোকানও । এসব কথার অবতারনা এজন্য যে এখন নাকি এসব ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলোকেও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ BFSA )

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে ছোট দোকানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার খবর দিয়ে বিএফএসএ চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এটা ইতিবাচক পদক্ষেপ, পর্যায়ক্রমে স্ট্রিটফুডও তদারকিতে আসবে। আর রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, বিধিমালাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে, এতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়বে। তবে ফুটপাতে যারা খাবার বিক্রি করেন তাদের কোনো সংগঠন নেই বলেই হয়তো ”ইটালি হোটেল” যারা চালান তাদের ভাষ্য গনমাধ্যমে আসেনি।
রাস্তার পাশে টং দোকানের চা, ফুটপাতের ফুচকা-চটপটি, আর মহল্লার ছোট রেস্তোরাঁর ভাত-ডাল — এটাই ঢাকাসহ সারা দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন খাবার। এতদিন এই দোকানগুলো চলত সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে। অনেকে আবার ফুটপাত ইজারাদার হিসেবে পরিচিত এলাকার রাজনৈতিক মাস্তানদের হাতে দুপয়সা দিয়ে দোকান চালাতেন।
এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। গত ১৬ জুলাই গেজেট প্রকাশের পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে তা কার্যকর হচ্ছে।এর মানে, ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই আর হবে না। খাবার বিক্রি করতে হলে এখন বিএফএসএর নিবন্ধন বা লাইসেন্সও লাগবে। এর আওতায় আসবে ফুটপাতের অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দোকান, চায়ের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, যা অনেকেই গুলিয়ে ফেলছেন। সবাইকে লাইসেন্স নিতে হবে না। সাধারণ ও ক্ষুদ্র ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য লাগবে নিবন্ধন। আর বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের জন্য লাগবে লাইসেন্স। টং দোকান, ফুচকা, পিঠা-পুরি, ছোট রেস্তোরাঁ — এরা নিবন্ধনের আওতায় পড়বে। আর ভালো খবর হলো, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করা হবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর।কর্তৃপক্ষের যুক্তি সোজা। ট্রেড লাইসেন্স মানে ব্যবসা করার অনুমতি, খাবার নিরাপদ কিনা তার গ্যারান্টি নয়। ট্রেড লাইসেন্স দিতে গিয়ে কেউ দেখে না দোকানে পানি কোথা থেকে আসে, তেল কতবার ব্যবহার হয়, খাবার ঢেকে রাখা হয় কিনা। ফলে ভেজাল, পোড়া তেল, নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার খেয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।গনমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেলো বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, বিধিমালাটি হওয়ার কারণে এখন এসব দোকান নিবন্ধনের আওতায় আসবে এবং তাদের খাবারের মান যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে। তার ভাষায়, “খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হয়েছে এটি। আমরা হয়তো একদিনেই সব পরিবর্তন করতে পারবো না। তবে পর্যায়ক্রমে স্ট্রিটফুডের দোকানগুলোও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তদারকির আওতায় আসবে।”
নিরাপদ খাদ্য কতৃপক্ষের এই উদ্যোগের পক্ষে যারা, তারা বলছেন, এটা আসলে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও ভালো। লাইসেন্স বা নিবন্ধন থাকলে ক্রেতার আস্থা বাড়বে। এখন অনেকেই ফুটপাতের খাবার খেতে ভয় পান। পরিচ্ছন্নতার সনদ থাকলে সেই ভয় কমবে, বিক্রি বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের কাছে স্ট্রিটফুড সেক্টরের একটা সত্যিকারের তথ্যভান্ডার তৈরি হবে, যা দিয়ে প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ বা স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কাজ করা যাবে।
নিরাপদ খাদ্য কতৃপক্ষের বাইরেও অনেকেই মনে বিধিমালাটি হওয়ায় এসব দোকান এখন একটা কাঠামোর ভেতরে এলো।কিন্তু আপত্তিটা আসছে বাস্তবতা থেকে। টং দোকানদারের মাসিক আয় কত? দিনে ৫০০-১০০০ টাকা লাভ হলেই অনেক। তার ওপর যদি দুই দপ্তরের দুই লাইসেন্স, দুইবার কাগজপত্র, দুইবার পরিদর্শনের ঝামেলা চাপে, তাহলে ছোট ব্যবসা টিকবে কী করে? অনেক দোকানদারেরই জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া আর কোনো কাগজ নেই। অনলাইনে আবেদন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ, ট্রেনিং সার্টিফিকেট — এসব জোগাড় করা তাদের জন্য কঠিন।বড় আশঙ্কা হয়রানির। এখনই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে দালাল আর ঘুষের অভিযোগ আছে। আরেকটা নিবন্ধন মানে আরেকটা দরজা, আরেকটা সুযোগ। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, বিধিমালাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে এবং এতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়বে। তার মতে, “এখানে অথরিটির ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই।”যদি পরিদর্শনের নামে মাসে মাসে টাকা তোলা শুরু হয়, তাহলে খাবারের মান বাড়বে না, বরং দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। তখন এই লাখ লাখ মানুষ যাবে কোথায়? স্ট্রিটফুড শুধু খাবার নয়, এটা কর্মসংস্থান।তাহলে সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন নয়, আগে সহজ করা দরকার। যেমন, একই জানালা থেকে ট্রেড লাইসেন্স আর খাদ্য নিবন্ধন দেওয়া, মোবাইলে আবেদনের ব্যবস্থা, আর সবচেয়ে জরুরি, শাস্তির আগে প্রশিক্ষণ। পানি ফুটিয়ে ব্যবহার, হাত ধোয়া, খাবার ঢেকে রাখা, তেল বারবার ব্যবহার না করা — এই সাধারণ বিষয়গুলো শেখালে অনেক ঝুঁকি এমনিতেই কমে যাবে।নিরাপদ খাবার সবার অধিকার, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রশ্ন হলো, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি ছোট মানুষের পেটে লাথি মারব, নাকি তাকে সঙ্গে নিয়ে এগোবো? নিবন্ধন যদি হয় সহজ, বিনামূল্যের আর হয়রানিমুক্ত, তাহলে তা সুরক্ষা দেবে। আর যদি হয় আরেকটা কাগজের বোঝা, তাহলে টংয়ের চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি।
প্রণব সাহা




