
মাঠে ফসল ফলানো, বীজ সংরক্ষণ, গবাদিপশু পালন কিংবা ফসল ঘরে তোলার কাজ- কৃষির প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই রয়েছে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ। পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তারা। অথচ কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, জমির মালিকানা, ন্যায্য মজুরি ও ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। কৃষিতে অবদান রাখলেও অনেক নারী থেকে যাচ্ছেন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘জেগে উঠুক গ্রামীণ নারী: বেইজিং+৩০-এর পথে সহনশীল গ্রামীণ ভবিষ্যৎ’। ২০২৬ সাল আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হওয়ায় কৃষিতে নারীর অবদান ও অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বঞ্চনা এবং বৈষম্যের মধ্যেই নারীরা কৃষিতে নিজেদের অবদান রেখে যাচ্ছে ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের কর্মজীবী নারীদের প্রায় ৬০ দশমিক ৮ থেকে ৬৫ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাদের বড় একটি অংশ পারিবারিক কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও এর বিনিময়ে সরাসরি মজুরি পান না। জমির মালিকানা না থাকায় অনেক নারী কৃষক সরকারি সহায়তা, কৃষি উপকরণ ও প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেন।
জমির মালিকানায় বৈষম্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নারীদের মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশের এককভাবে জমির মালিকানা রয়েছে। ফলে কৃষক হিসেবে নিবন্ধন, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণ এবং কৃষিসংক্রান্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
কৃষিশ্রমে মজুরি বৈষম্যও বড় সমস্যা। প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিক দৈনিক গড়ে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিক পান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। একই ধরনের কাজে অংশ নিয়েও নারীদের কম মজুরি পাওয়ার প্রবণতা তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে।
এর বাইরে গৃহস্থালি ও পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার বড় দায়িত্বও সামলাতে হয় নারীদের। সময় ব্যবহার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নকাজে ব্যয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময় গড়ে ১ দশমিক ১ ঘণ্টা। অথচ এসব কাজের অর্থনৈতিক মূল্য সাধারণত হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও গ্রামীণ নারীদের জন্য বাড়তি সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, সুপেয় পানির অভাব ও জীবিকার অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় নারী কৃষকের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, জমি ও ঋণে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, সমান কাজের জন্য সমান মজুরি এবং অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোও জরুরি।
গ্রামীণ নারীর শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদন, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসে তাই তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বৈষম্য দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।




