
উচ্চ ফলনশীল জাতের জয়জয়কার আর আধুনিক নিবিড় কৃষির হাত ধরে বিশ্বজুড়ে শস্যের ফলন ও আকার বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু সেই প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ বিপর্যয়—খাদ্যশস্যের ক্রমাগত পুষ্টিহীনতা। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মৃত্তিকা উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্যালোরির প্রাচুর্যে পেট ভরলেও আমাদের অজান্তেই থালায় বিষাদ ছড়াচ্ছে ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা অণুপুষ্টির তীব্র ঘাটতি। আর এর মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে আমাদের রুগ্ণ ও খরখরে হয়ে পড়া মাটিতে।
ক্যালোরির আড়ালে ফাঁপা ফসল
যুক্তরাজ্যের ‘ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস’ এবং ‘মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্ট’-এর ‘হলো হারভেস্ট’ শীর্ষক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, গত কয়েক দশকে চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৬ সালের মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে উদ্ভিদে শর্করা বাড়লেও প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে জিংক ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডিলিউশন ইফেক্ট’—যেখানে ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব আনুপাতিক হারে পাতলা হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ৬০ বছর আগের একটি গাজর থেকে প্রাপ্ত পটাশিয়াম পেতে আজ একজনকে দ্বিগুণ গাজর খেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: খরখরে মাটি ও পুষ্টিহীন ভাত
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও বেশি উদ্বেগের। চাল আমাদের প্রধান খাদ্য হলেও প্রথাগত উচ্চ ফলনশীল চালের পুষ্টি ঘনত্ব কমে যাওয়ায় এবং অতিরিক্ত ছাঁটা ও পালিশ করা ‘মিনিকেট’ চাল খাওয়ার প্রবণতায় চালের জিংক ও আয়রনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ নারী তীব্র জিংকের ঘাটতিতে ভুগছেন।
তবে ফসলের এই ফাঁপা রূপের পেছনে বড় কারণ মাটির চরম অবনমন:
জৈব উপাদানের শূন্যতা: এসআরডিআই-এর তথ্যমতে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি ফসলি জমির মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার চেয়ে কমে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
পুষ্টিহীন জমি: নিবিড় চাষাবাদ ও রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে প্রায় ৭৬.২ শতাংশ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে জিংক, বোরন ও সালফারের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
নীতিগত উদাসীনতা ও ভবিষ্যতের হুমকি
দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি বিশেষজ্ঞ ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে জৈব চাষাবাদ বাড়ানো, মাটির সজীবতা রক্ষা এবং জৈব সারে ভর্তুকি দেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু নীতিগত পর্যায়ে এ বিষয়ে কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
অত্যধিক রাসায়নিক সার ব্যবহার ও নিবিড় চাষাবাদের ফলে মাটির গভীরে থাকা ‘মাইকোরাইজাল ছত্রাক’ ও উপকারী অণুজীবের অনুকূল নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা স্বাভাবিক নিয়মে মাটি থেকে উদ্ভিদের খনিজ শোষণে মূল ভূমিকা রাখে। এর ফলে আমাদের উর্বর জমিগুলো দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে প্রাণহীন, কঙ্করময় ও খরখরে মাটিতে—যেখানে ভবিষ্যতে ফসল ফলানোই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সংকট নিরসনে নতুন ভাবনা
খাদ্য নিরাপত্তার ধারণা এখন কেবল ‘পেট ভরানো’ বা ‘ক্যালোরি জোগানো’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন গুণগত পুষ্টি ও সজীব মাটির সুরক্ষার প্রশ্ন।
উৎপাদন নয়, পুষ্টিভিত্তিক মূল্যায়ন: কৃষকদের শুধুমাত্র ফসলের ওজনের ভিত্তিতে না দেখে, উৎপাদিত ফসলের ‘নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি’ বা পুষ্টি ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ণ ও প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। জৈব কৃষি ও মাটির অনুজীব রক্ষা: মাটিতে রাসায়নিকের নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ও অণুজীব ইনোকুল্যান্ট ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জৈব সার খাতে সরাসরি কার্যকর ভর্তুকির রূপরেখা তৈরি করা আবশ্যক। বায়োফর্টিফাইড ও প্রথাগত শস্যের প্রসার: ব্রি ধান-৭৪, ব্রি ধান-১০০ এর মতো জিংকসমৃদ্ধ বায়োফর্টিফাইড চাল এবং উন্নত ‘হেলদিয়ার রাইস’-এর সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রথাগত স্থানীয় শস্য ও মিলেটের চাষ পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: অতিরিক্ত পালিশ করা সাদা চালের বদলে পুষ্টি অটুট থাকা চাল খাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
মাটি সজীব না থাকলে ফসল পুষ্টিকর হতে পারে না, আর পুষ্টিকর খাদ্য ছাড়া সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব নয়। খাদ্য নিরাপত্তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে এখনই রাসায়নিক-নির্ভর কৃষি নীতি থেকে সরে এসে মাটি ও খাদ্যশস্যের পুষ্টি পুনর্গঠনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।




