Spread the love

জেন জি জেনারেশন কিমচি চেনে না- হতেই পারে না! কে-ড্রামা আর কে-পপের বাঁধভাঙা জোয়ারে কোরীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে এই বিশেষ খাবারটিও এখন স্থান করে নিয়েছে বাঙালির রসনাবিলাসে। ফেসবুকে পেজ খুলে আগাম বুকিং নিয়ে বিক্রি হচ্ছে কিমচি, কারণ তা তৈরি হতে বেশ সময় লাগে। আপাতদৃষ্টিতে মসলা ও চীনা বাঁধাকপির এই গাঁজানো (Fermented) আচারটি আর আমাদের প্রচলিত আচারের মধ্যে মূল তফাত এটাই—আমাদের আচার যেখানে রোদ, তেল ও মসলার মেলবন্ধন, কিমচি সেখানে পুরোটাই প্রাকৃতিক গাঁজন প্রক্রিয়ার ফসল। এমনকি কোরিয়ার আধুনিক পরিবারগুলোতে কিমচির বিশেষ গুণাগুণ ও স্বাদ বছরের পর বছর ধরে রাখার জন্য পৃথক ফ্রিজও ব্যবহার করা হয়। যাতে তাপমাত্রা নিখুঁত রেখে এর স্বাদ ও ব্যাকটেরিয়াল গুণাগুণ বছরের পর বছর বজায় রাখা যায়। কোরীয়দের জীবনের কঠিন ও সুখের সময়ের নিরন্তর সঙ্গী এই কিমচি। একটি সাধারণ বাঁধাকপি লবণ ও মসলার ছোঁয়ায় কিমচি হয়ে উঠেছে পুরো জাতির আত্মপরিচয় এবং আন্তর্জাতিক উৎসব। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল মসলা ও চীনা বাঁধাকপির একটি গাঁজানো আচার।

কিমচির ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো। কোরিয়ার তীব্র শীতকালে যখন কোনো শাকসবজি জন্মাত না, তখন দীর্ঘসময় সবজি তাজা ও খাওয়ার উপযোগী রাখার জন্য লবণ দিয়ে ভিজিয়ে রাখার পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল কেবল লবণাক্ত সবজি, যা ‘জিমচে’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এটি উচ্চারিত হতে হতে ‘কিমচি’ রূপ নেয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে কোরিয়ায় লাল মরিচের আগমন ঘটে। লাল মরিচ আসার পর কিমচির চেহারায় আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রসুন, আদা, শুঁটকি মাছের সস এবং মরিচের গুঁড়োর মিশ্রণে তৈরি হতে থাকে আধুনিক লাল ও মসলাদার কিমচি।


কিমচি কেবল একটি খাবার নয়, এটি কোরীয়দের কাছে যৌথ পারিবারিক ও সামাজিক উদযাপনের একটি অন্যতম বড় উৎসব। প্রতিবছর শরতের শেষের দিকে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) কোরিয়াজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘কিমজাং’ নামের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। কিমজাং-এর সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা এক জায়গায় একত্রিত হন। সবাই মিলে শয়ে শয়ে বাঁধাকপি পরিষ্কার করেন, লবণে ভিজিয়ে রাখেন এবং মসলা মাখিয়ে মাটির বা আধুনিক পাত্রে সংরক্ষণ করেন। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর সবাই মিলে সদ্য তৈরি করা কাঁচা কিমচির সাথে সিদ্ধ করা মাংস খেয়ে আনন্দ উপভোগ করেন। ২০১৩ সালে ইউনেস্কো এই ‘কিমজাং’ প্রথাকে মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।


কিমচিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘সুপারফুড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পেছনের মূল কারণ হলো এর প্রাকৃতিক গাঁজন প্রক্রিয়া । ল্যাকটোব্যাসিলাস অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজমশক্তি উন্নত করে। ভিটামিন এ, সি ও কে এবং উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে কোষের বার্ধক্য ধীর করে এবং দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। রসুন ও আদার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে এবং ফ্লু ও ভাইরাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। কম ক্যালরি ও ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি রক্তে কোলেস্টেরল কমায়, মেদ ঝরাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
মাংস, রুটি আর একটু কিমচি আপনিও চেখে দেখতে পারেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সার্চ দিলেই হাতের নাগাল পেয়ে যাবেন।

শাঁওলী সুমন