Spread the love

 

কৃষিপ্রধান দেশে যখন  কৃষি পণ্য বাজারজাত করার কোনো আদর্শ সরবরাহ ও বিপনন ব্যবস্থেই গড়ে উঠেনি সেক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না। চরে রীতিমত যুদ্ধ করে যে কৃষক পতিত জমিতে ফসল ফলায় তার শস্য সংরক্ষণের কোনো উপায়ই তার কাছে নাই।বাধ্য হয়ে তাকে মাঠ থেকে সরাসরি বিক্রি করে দিতে শ্রমঘামে উৎপাদিত ফসল। সেখানে সে ন্যায্য মূল্যটাও পায় না। ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চরাঞ্চলে কৃষি পণ্যের বিপণন ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একথাগুলেই বলেছেন চরাঞ্চল কৃষিকাজের বিশেষজ্ঞ ডক্টর একেএম জাকারিয়া। গত সপ্তাহে ক্ষেতেপাতের সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক মুখোমুখি হয়েছিলেন এই কৃষিবিজ্ঞানীর ।

প্রশ্ন ছিল চর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য  সফল প্রযুক্তি কোনগুলো ? ডক্টর  জাকারিয়া  বললেন “ আমরা জানি, ভৌগোলিক কারণেই চরাঞ্চল দেশের অন্য সব এলাকা থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন। নদীর বুকে জেগে ওঠা এই দুর্গম চরগুলোতে বাস করেন বহু পরিশ্রমী মানুষ। তাঁদের প্রধান জীবিকা কৃষি। চরের উর্বর পলিমাটিতে প্রতি বছর প্রচুর ফসল ও কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু কষ্টের ফসল ফলানোর পরও তারা যথাযথ আর্থিক সুফল পান না। তার বড় কারণ সময়মতো তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছানো এবং ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করার চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া কাঁচা রাস্তা এবং নৌপথের ওপর নির্ভরতার কারণে পরিবহনে অনেক বেশি সময় ও খরচ লাগে। তার ওপর চরাঞ্চলে ফসল সংরক্ষণের মতো কোনো আধুনিক গুদাম বা হিমাগার গড়ে ওঠেনি। ফলে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। এর সাথে যুক্ত আছে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

দীর্ঘসময়  চরের কৃষকদের সঙ্গে কাটানো কৃষিবিজ্ঞানীর কাছে প্রশ্ন ছিল ফসল সংরক্ষণের কৌশল কি। চরের ফসল কিভাবে মুল বাজারে যেতে পারে ? তিনি জানিয়েছেন চরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে চরের বাস্তবতার সাথে মানানসই স্থানান্তরযোগ্য শস্যাগার তৈরি ও শস্য জমা রেখে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি গ্রহণ করার দিকে জোর দেয়া প্রয়োজন।

কৃষি বিশেষজ্ঞ একেএম জাকারিয়া বলেন, গুদাম হলো মার্কেটিং সিস্টেমের সবচেয়ে অপরিহার্য অংশ। সেটা পাইকারের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, কৃষকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং এক্সপোর্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেজন্য মার্কেটিং সিস্টেম তৈরি করা খুব জরুরি। চরাঞ্চলে এখন স্থানান্তরযোগ্য মার্কেটিং স্টোর হাউস তৈরি করা হচ্ছে যেখানে আমরা কিছু সময়ের জন্য কৃষকের পণ্যকে আমরা সংরক্ষণ করতে পারবো। তবে এটার সাথে একটা ভালো ম্যাচিং হয় যদি এই গুদামাগারের সাথে কৃষিঋণ ম্যাচ করা যায়। তাহলে কৃষকরা বেশি উপকৃত হবে। তারা দীর্ঘদিন এই শস্যকে সংরক্ষণ করতে পারবে। কারণ কৃষকের নগদ টাকার দরকার আছে। বিশেষত চরের কৃষকের অভাব বেশি, তার নগদ টাকার দরকার আছে। তাকে যদি তার শস্য রেখে কিছু ঋণ দেওয়া হয় তার শস্যের বিপরীতে, তাহলে সে অনেকদিন পর্যন্ত শস্যটা সংরক্ষণ করবে ।  যে মার্কেটের যে ওয়াইডার গ্যাপ, মূল্যের যে বড় ব্যবধান হয়ে যায় কিছুদিন সংরক্ষণের মধ্যেই, সেই লাভটা তারা পাবে, তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। এখানে আমরা স্যান্ডউইচ প্যানেল ব্যবহার করেছি, আমরা ময়শ্চার কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করেছি যাতে করে এখানে দীর্ঘ সময় ধরে চরের কৃষকের ফসল ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং তারা ন্যায্য মূল্যটা পায়। এখানে দরকার হলো যে স্টোরেজ গ্রেইন বা যেটাই রাখুক তার বিপরীতে কৃষককে যেন একটি ঋণ সুবিধার আওতায় আনা যায়।

ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি মানে কি? কোন ধরনের প্রযুক্তিকে আপনি ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি বলবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জনাব একেএম জাকারিয়া জানালেন চরাঞ্চল কেবল বিপণন সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাও আসে এই এলাকাগুলোতে। তাই কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে এবং ফলন বাড়াতে ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা ও টেকসই সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোন ধারণা বা প্রেডিকশন নয়, এটি এখন একটা বাস্তবতা।  আমাদেরকে এই বাস্তবতার মধ্যেই বেঁচে থাকতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। এই যে এগিয়ে যাওয়া বা বেঁচে থাকার যে উপায়গুলো, এগুলোই হলো ক্লাইমেট স্মার্ট সিদ্ধান্ত বা প্রযুক্তি বা মডেল আমরা বলি। এখানে তিনটা জিনিসকে নিয়ে আসলে ক্লাইমেট স্মার্টের একটা ভালো ডেফিনেশন হতে পারে। একটি হলো যে প্রযুক্তিটা ব্যবহার করে উৎপাদন কমবে না, বরং উৎপাদন বাড়বে। দ্বিতীয় হলো যে এটা বৈরী পরিবেশে এটা টিকে থাকবে। এবং তিন নম্বরটা হলো জলবায়ুর যে সমস্যা বা জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিষয়টা সেখানে মূল কারণটা সেটা হলো মিথেন ইমিশন। তাহলে এই মিথেন ইমিশন কমাবে। এই তিনটা জিনিসকে এড্রেস করে যে বিষয়টা দাঁড়ায় সেটা হলো অ্যাডাপ্টেশন এবং মিটিগেশন। অ্যাডাপ্টেশন হলো উৎপাদন বাড়বে এবং বৈরী পরিবেশে টিকে থাকবে। আর মিটিগেশন হলো এই সমস্যাটাকে কমাবে, অর্থাৎ মিথেন ইমিশনকে কমাবে। ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি আমরা উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যে এডব্লিউডি টেকনোলজি, সোলার ইরিগেশন প্রোগ্রাম— এগুলো ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি। এখানে এই তিনটা কম্পোনেন্টের কম্বিনেশন আছে যে উৎপাদন বাড়বে, বৈরী পরিবেশে টিকে থাকবে এবং মিথেন ইমিশন কমাবে।

একএম জাকারিয়া বলেন, চরাঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে এই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একদিকে আধুনিক ও স্থানান্তরযোগ্য স্টোরহাউসে স্যান্ডউইচ প্যানেল ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব। অন্যদিকে শস্য জমা রেখে ঋণ সুবিধা দিলে কৃষক আর্থিক সুরক্ষা পাবেন। এর পাশাপাশি এডব্লিউডি  বা সোলার ইরিগেশনের মতো ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটালে চরের কৃষি আরও টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠবে।