Spread the love

দেশে খাদ্য উৎপাদন যেমন বেড়েছে , তেমনি বেড়েছে ক্যালরীযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কিন্তু পুষ্টি’র ঘাটতি মোকাবেলায় এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষের পুষ্টি ঘাটতি বিদ্যমান যা প্রায় প্রতি ৪ জনে ১ জন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি সুপারফুড মাশরুম খাওয়ার প্রচলন বাড়াতে পারলে তা পুষ্টিগুন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। মাশরুম আয়রন, জিঙ্ক ও অন্যান্য উপাদানে ভরপুর, সহজলভ্য এবং কমখরচে উৎপাদনযোগ্য-যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুবই সম্ভাবনাময়।

‘সব্জি’র রাণী’ খ্যাত ও ‘নির্দোষ প্রোটিন’ হিসেবে বিবেচিত মাশরুম হতে পারে বাংলাদেশের অপুষ্টি মোকাবেলার একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। এটি শুধু পুষ্টি ঘাটতি পূরণই করে না, বরং মাশরুম চাষ ও বিপনন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। মাশরুম একটি সুস্বাদু, অধিক পুষ্টি ও ঔষধিগুণসম্পন্ন খাবার। মাশরুমে আমিষের পরিমাণ প্রায় ২৫-৩৫% যা মাংস, দুধ ও ডিমের সমতুল্য।

গ্রাম ও শহরে মাশরুম সহজেই চাষ করা সম্ভব বিধায় পুষ্টি ঘাটতি পূরণ ও দারিদ্র্য দূরীকরণ উভয় দিকেই সাহায্য করতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে তথা পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি যে কেউ মাশরুম চাষাবাদকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন।

বাংলাদেশে প্রায় চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে মাশরুম উৎপাদন বৃদ্ধি, মান উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে সহযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দেশের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান মাশরুম উন্নয়ন ইন্সটিটিউট। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের মাঝে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে মাশরুম উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে এই ইন্সটিটিউট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং এর আওতাধীন মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মাশরুমের সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের মাঝে উন্নতমানের  বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কর্মসুচী জোরদার করেছে বলে দাবী করেছেন সাভারের মাশরুম ইন্সটিটিউটের উপপরিচালক ড. মোঃ ফেরদৌস আহমেদ।

গত সপ্তাহে ক্ষেতে-পাতে টিম মাশরুম উন্নয়ন ইন্সটিটিউট পরিদর্শনকালে তিনি জানান, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট দেশের ৩৪টি মাশরুম উপকেন্দ্র/ হর্টিকালচার সেন্টার এর সহায়তায় দেশের সকল জেলার ১৬০টি উপজেলা এবং ১৫টি মেট্রোপলিটন থানায় মাশরুমের উদ্ভাবিত নতুন নতুন জাত ও দেশোপযোগী আধুনিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মাঝে সম্প্রসারণ করছে। গুণগত ও মানসম্পন্ন মাশরুম উৎপাদন প্রযুক্তি, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইন্সটিটিউটটি মাশরুমজাত পণ্যের গুণগত মানের প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করছে।’

ইন্সটিটিউটের চলমান ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান বলেন, দেশের যে কোন আগ্রহী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অথবা মাঝারি ও বড় আকারের মাশরুম শিল্প প্রতিষ্ঠান চাইলে এই ইন্সটিটিউটের কারিগরি সহযোগিতা নিতে পারেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে ওয়েস্টার মাশরুম সবচেয়ে বেশি চাষ হয়, কারণ এটি সহজ, কম খরচে উৎপাদনযোগ্য এবং স্থানীয় পরিবেশে উপযোগী। সম্প্রতি ওয়েষ্টার মাশরুমেরই কয়েকটি নতুন জাত ‘পিঙ্ক ওয়েষ্টার’, ‘পার্ল ওয়েষ্টার’ এবং উচ্চ ওষুধিগুণ সম্পন্ন ‘ঋষি মাশরুম’ এর চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। এগুলো গ্রীস্মমন্ডলীয় আবহাওয়ায় খুব ভাল জন্মে। তবে, মিল্কি, প্যাডি স্ট্র ও শিটাকে মাশরুম চাষ বাণিজ্যিকভাবে অধিক লাভজনক। দেশে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় আকারের বাণিজ্যিক মাশরুম খামার গড়ে উঠেছে যা খুবই ইতিবাচক। তবে মাশরুমের বাজারসম্প্রসারণে সরকারের আরও অধিকতর কার্যক্রম প্রয়োজন বলে উদ্যোক্তাদের অভিমত। বিশেষ করে সবার পাতে মাশরুম জনপ্রিয় করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা, গণসংযোগ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী প্রয়োজন। প্রতিটি পরিবারে মাশরুম খাওয়া জনপ্রিয় করতে হলে পরিবারের নারী সদস্য এবং কিশোর-তরুণদের সম্পৃক্ত করা জরুরী।

খাদ্য নিরাপত্তার মূল কথাটাই হলো সকল মানুষের, সব সময়ের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাবার মত শারীরিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা থাকা; অর্থাৎ সহজ প্রাপ্যতা, পাবার নিশ্চয়তা এবং স্থিতিশীলতা। এর দায়িত্ব সরকারের এবং সেটা সাংবিধানিক। খাদ্যের বাজারে সংকট রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরী করে তাই যে কোন সরকারের লক্ষ্য থাকে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা। মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে সহযোগিতা প্রদান তাই সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এই মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা যা বাংলাদেশের একমাত্র  মাশরুমের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের উদ্দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা ও প্রশিক্ষণসেবা মূলক প্রতিষ্ঠান। সবার পাতে মাশরুম নিয়ে যেতে হলে এই প্রতিষ্ঠানের সেবা সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা দরকার বলেও মনে করেন ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাগণ।

আতাউর রহমান মিটন