
বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ নিয়ে আকস্মিক এক সিদ্ধান্তে ২৭ লক্ষ টন খাদ্য উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরাও পড়েছেন মহা সংকটে।
সম্প্রতি বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করে গেজেট জারি করেছে সরকার। হঠাৎ করেই সেচ ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই সিদ্ধান্তে কৃষি খাত গভীর সংকটে পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে চলতি মৌসুমেই প্রায় ২৭ লাখ টন ফসল উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রায় ২৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি জারিকৃত এক গেজেটে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার বরেন্দ্র এলাকার ৪ হাজার ৯১১ মৌজাকে ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়। এতে খাওয়ার পানি ছাড়া সেচসহ অন্য যেকোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিবেশ সুরক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাসের কথা তুলে ধরে এই আদেশ জারি করা হয়। তবে কৃষিকাজ কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা, বিকল্প সেচব্যবস্থা কিংবা ক্ষতিপূরণের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ এলাকা। কম বৃষ্টিপাতের কারণে এখানকার কৃষি দীর্ঘদিন ধরেই সেচনির্ভর। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) মাধ্যমে সরকার হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে বোরো ধানসহ সেচনির্ভর ফসল চাষে উৎসাহ দেয়। এ নীতির ফলে শস্য বিন্যাস, ভূমি ব্যবহার, ঋণব্যবস্থা এবং গ্রামীণ জীবিকা আমূল বদলে যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের পুরো অর্থনীতি গড়ে ওঠে নলকূপনির্ভর সেচব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে।
ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, গেজেট জারির আগেই তারা বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতে বিনিয়োগ করেছেন। এখন সেচ বন্ধ হলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। অথচ কোনো সহায়তার নিশ্চয়তা নেই।
বরেন্দ্র এলকার মধ্যে অনেক জমি আছে যেগুলো চাষের জন্য ভূ গর্ভের পানির উপর নির্ভর করতে হয়। নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলার কৃষকেরা জানান, সেখানে কার্যকর কোনো ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস নেই। খালগুলো ভরাট, জলাধার সীমিত এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থাও নেই।
কৃষকরা জানান, বরেন্দ্র কোনো অনাবাদি অঞ্চল নয়। ধান থেকে সবজি–এখানকার সবকিছুই সেচনির্ভর। কৃষকদের সঙ্গে কথা না বলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গেজেটে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের দায় কৃষকদের ওপর চাপানো হলেও এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা উপেক্ষা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, গেজেটে পরিবেশ সুরক্ষা ও কৃষি বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় নেই। এমনকি বিকল্প উন্নয়নের দায়ভার কার, তা-ও স্পষ্ট নয়। এ ধরনের অসম প্রয়োগ পরিবেশ সুরক্ষা যেমন ব্যাহত করবে, তেমনি পানি ব্যবস্থাপনায় মানুষের আস্থাও নষ্ট করবে বলে মনে করেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির সংকট বাস্তব, পরিবর্তন দরকার। কিন্তু হঠাৎ কৃষকদের থামিয়ে দিলে তা কাজ করবে না। ধাপে ধাপে এবং বিকল্প দিয়ে এগোতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরই এ সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়ন করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএমডিএর এর সূত্রে জানা যায় এটি বাস্তবায়ন করা হলে ২৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকবে এবং চলতি মৌসুমেই প্রায় ২৭ লাখ টন ফসল উৎপাদন কমে যাবে। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা যেমন সংকটে পড়বেন আবার দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে।




