Spread the love


 

পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু মেহেরপুরের মুজিবনগর কিংবা ফরিদপুরের সালথার কৃষকদের ঘরে এখন এক ভ্যাপসা, ঝাঁঝালো পচা গন্ধ। যে প্রযুক্তি কৃষকের ঘরের পেঁয়াজ ৯ মাস তাজা রাখার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ দেড় বছরের মাথায় সেই প্রযুক্তির ব্যর্থতায় বস্তা বস্তা পেঁয়াজ ছুড়ে ফেলতে হচ্ছে ডাস্টবিনে।

পেঁয়াজ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ভরা মৌসুমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গত দেড় বছর আগে  সরকার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের যৌথ অর্থায়নে দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে মোট ১১ হাজার ৭০০টি আধুনিক ‘এয়ার-ফ্লো মেশিন’ বিতরণ করা হয়।

পরিকল্পনাটি কাগজে কলমে ছিল অনবদ্য। প্রতিটি মেশিন ও তার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয় ২৭ হাজার টাকা, আর আশার আলো দেখে প্রান্তিক কৃষকেরা নিজেদের পকেট থেকে দেন ১৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং কৃষকদের অংশসহ মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের বলেছিলেন, এই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে প্রায় ৯ মাস। ঘরে বসেই কৃষকেরা পেঁয়াজ ধরে রাখতে পারবেন এবং অফ-সিজনে ভালো দামে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখবেন। এমনকি এই মেশিনগুলো ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত অনায়াসে সার্ভিস দেবে বলেও গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তব রূপ ধারণ করতেই বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট । ৯ মাসের গ্যারান্টি, মাত্র ৩ সপ্তাহেই পরিণত হলো পচনের ট্র্যাজেডিতে।

লোডশেডিংয়ের অন্ধকারলোহার বাক্সে বন্দি কৃষকের ভাগ্য

এই আধুনিক প্রযুক্তির মূল ভিত্তি ছিল নিরবচ্ছিন্ন বাতাস চলাচল (এয়ার-ফ্লো)।বর্তমানে দেশের গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে মেহেরপুর ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী বেল্টগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ। কৃষকদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাকি ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টাই কাটাতে হয় অন্ধকারে। আর এই বিদ্যুৎহীনতাই আধুনিক এয়ার-ফ্লো মেশিনগুলোকে একেকটি নিষ্ক্রিয় লোহার বাক্সে পরিণত করেছে।

মেশিন সচল থাকলে বাতাস চলাচলের মাধ্যমে পেঁয়াজের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন বন্ধ থাকে । এর ফলে বদ্ধ ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ও ভ্যাপসা গরম উল্টো বহুগুণ বেড়ে যায়। এই কৃত্রিম গুমোট আবহাওয়ায় পেঁয়াজে দ্রুত ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঘটছে এবং চোখের পলকে তা পচে গলে যাচ্ছে।

মেহেরপুর থেকে ফরিদপুরজেলায় জেলায় হাহাকার

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার ভবেরপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আউয়াল এবার ভালো দামের আশায় তার কষ্টের পেঁয়াজ এই নতুন প্রযুক্তির ঘরে তুলেছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার সেই আশায় গুড়ে বালি। প্রতিদিন তাকে পচা পেঁয়াজ বেছে বাইরে ফেলে দিতে হচ্ছে। একই উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের চাষি ও ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের শেখানো প্রতিটি নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার পরও তার কয়েকশ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। বিপদে পড়ে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান বা সান্ত্বনা মেলেনি।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য কিছুটা দায় কৃষকদের ওপরও চাপাতে চাইলেন। তারা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। এছাড়া তাপমাত্রা এবং আগে থেকেই রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ ঘরে তোলার কারণেও এমনটা হতে পারে। তবে তারা স্বীকার করেন, বিদ্যুৎ সংকট এই পচনের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

একই চিত্র দেশের অন্যতম শীর্ষ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরেও । চলতি অর্থবছরে জেলাটিতে রেকর্ড ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। কৃষকদের সহায়তায় এখানে প্রায় ২,১৩০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সালথা ও অন্যান্য উপজেলার মাঠের চিত্র একই। ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর স্বীকার করেছে, এয়ারফ্লো মেশিন কার্যকর রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য । বিদ্যুৎ না থাকলে এই প্রযুক্তি থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।