Spread the love

 

জলবায়ু সংকটে নতুন এক বাস্তবতার মুখে মঙ্গোলিয়ার পশুর  চারণভূমি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। অন্তহীন নীল আকাশের দেশ মঙ্গোলিয়ার মাইলোর পর মাইল বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরের ৭০ শতাংশের বেশি অঞ্চল মরুমভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, পশুপালনের সনাতন কৌশল বদলে নতুন ‘প্রকৃতি-বান্ধব’ চারণ মডেল চালু করা না গেলে ধ্বংস হয়ে যাবে মধ্য এশিয়ার এই বিশাল বাস্তুতন্ত্র, আর চিরতরে ভিটেমাটি হারাবে শত শত বছরের যাযাবর সম্প্রদায়।

মঙ্গোলীয় পশুপালকদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভীতির নাম ‘জুদ’ (Dzud) বা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া। যেখানে গ্রীষ্মকালের তীব্র খরা চারণভূমিকে পুড়িয়ে শুষ্ক করে তোলে এবং এর পরপরই নেমে আসে হাড়কাঁপানো শীত ও ভারী তুষারপাত  এ সময় গ্রীষ্মে পর্যাপ্ত ঘাস না পেয়ে পশুরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে, আর শীতকালে বরফের পুরু আস্তরণ ভেদ করে পশুখাদ্য খুঁজে না পেয়ে লাখ লাখ গবাদিপশু বরফজমা মাঠে জমে মারা যায়। বিগত দুই দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মঙ্গোলিয়ায় এই সংহারী ‘জুদ’-এর পুনরাবৃত্তি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের গড় তাপমাত্রার তুলনায় মঙ্গোলিয়ায় গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতি এক বা দুই দশকে একবার জুদের মুখোমুখি হতে হতো, এখন তা প্রায় প্রতি এক বা দুই বছর পরপরই ফিরে আসছে।

জলবায়ুর এই তাণ্ডবের সাথে যুক্ত হয়েছে একটি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। ঐতিহাসিকভাবে মঙ্গোলিয়ার যাযাবর সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশুর সংখ্যা। একজন পশুপালকের কাছে বেশি পশু থাকা মানেই সমাজে অধিক সম্মান, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বিমা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাম্যবাদী শাসনের পতনের পর যৌথ খামারগুলো ভেঙে দেওয়া হয় এবং গবাদিপশু ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়। এর ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে পশুর সংখ্যা।

১৯৯০ সালে যেখানে মঙ্গোলিয়ায় মোট গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই কোটি, বর্তমানে তা সাড়ে সাত কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল পশুপালনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ক্যাশমেয়ার’ বা ছাগলের পশমের চড়া চাহিদা । কিন্তু এই বিপুল পশুর সংখ্যা চারণভূমির বাস্তুতন্ত্রকে চরম বিপর্যয়ে ফেলেছে। ছাগল ও ভেড়ার অতিরিক্ত বিচরণের ফলে ঘাসের শিকড় উপড়ে যাচ্ছে, মাটির ওপরের স্তরের উদ্ভিদের আস্তরণ পাতলা হয়ে ধুলোয় পরিণত হচ্ছে। যাযাবররা যে সম্পদকে তাঁদের বিমা ভেবেছিলেন, সেই অতিরিক্ত পশুর সংখ্যাই এখন চারণভূমির ধারণক্ষমতা ধ্বংস করে তাঁদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে।

চারণভূমির এই ক্ষয় জন্ম দিচ্ছে এক বিশাল সামাজিক সংকটের। প্রতিবার জুদের তাণ্ডবে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁরা পাড়ি জমান রাজধানী উলাণবাটরে। উলাণবাটরের চারপাশে গড়ে উঠেছে বিশাল ‘গের জেলা’ বা অস্থায়ী যাযাবর তাঁবুর বস্তি অঞ্চল। কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা, পয়োনিষ্কাশন বা কেন্দ্রীয় উত্তাপ ব্যবস্থা ছাড়া এই প্রান্তিক মানুষগুলো আধুনিক শহরের প্রান্তসীমায় জীবনসংগ্রাম করছেন। চারণভূমির মুক্ত বাতাসে জীবন কাটানো আত্মনির্ভরশীল পশুপালকেরা হঠাৎ করেই পরিণত হচ্ছেন শহরের সস্তা কায়িক শ্রমিক বা বেকার জনগোষ্ঠীতে।

যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, ভোলা বা সিরাজগঞ্জের নদীভাঙন ও লবণাক্ততায় নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলো যেভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকার কড়াইল বা ভাসানটেক বস্তিতে এসে ভিড় জমাচ্ছেন, ঠিক তেমনই মঙ্গোলিয়ার ‘গের জেলা’র চিত্র। মঙ্গোলিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তাদের বিপুল খনিজ সম্পদ—তামা, কয়লা ও সোনা। ওয়ু তোলগোই কিংবা তভান তোলগোইয়ের মতো মেগা খনি প্রকল্পগুলো দেশটির রাজস্বের চাকা সচল রাখছে। তবে অর্থনীতিতে খনিজ খাতের একক আধিপত্য থাকলেও দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রত্যক্ষ জীবিকা ও বেঁচে থাকার ভিত্তি এখনো এই পশুপালন। আবার খনি অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী চারণভূমির পথ। খনি থেকে নির্গত ধুলাবালি এবং ভূগর্ভস্থ পানির বিপুল ব্যবহার যাযাবরদের পানির উৎসগুলোকে শুকিয়ে ফেলছে। ফলে শিল্পোন্নয়ন ও প্রকৃতির এই দ্বন্দ্ব বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে তাদের।

এশীয়য় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার মূল সমাধান হিসেবে পশুর সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা থেকে বের হয়ে পশুপ্রতি উচ্চ মান ও মূল্য অর্জনের কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চারণভূমিকে পর্যায়ক্রমে বিশ্রামে রাখার মতো বাংলাদেশেও একই জমিতে বারবার এক ফসল না বুনে জমিকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সময় দিতে হবে। কম সংখ্যক গবাদিপশু থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উচ্চমানের মাংস ও চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। দুর্যোগ আসার আগেই পশুপালক ও কৃষকদের কাছে পূর্বাভাস পৌঁছানো এবং ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি জলবায়ু বিমা নিশ্চিত করা।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংকটই এখন আর একক দেশের সমস্যা নয়। মঙ্গোলিয়ার এই বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশের জন্যও সতর্কবার্তা। বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির ধারণক্ষমতা হ্রাস, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল নামার মতো সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

শাঁওলী সুমন