
কোনটি বেছে নেবেন? দামি আপেল নাকি পেয়ারা? দোকানে সাজানো সারি সারি ফলের মাঝে হয়তো আপনাকে হাতছানি দিচ্ছে গাঢ় লাল রঙের আপেল, কিংবা সবুজ আপেল। দামি ফল, ভাবছেন পুষ্টিও বেশি হবে। পাশেই দেশি পেয়ারাগুলো আপনার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে? তাহলে এখনই জেনে নিন। পুষ্টিবিদদের মতে, ভিটামিন সি-এর দিক থেকে একটি পেয়ারা বহু দামি আপেলকে বহু পেছনে ফেলে দেয়। পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, সমপরিমাণ আপেলের তুলনায় পেয়ারায় ভিটামিন সি-এর পরিমাণ প্রায় ৫০ গুণ বেশি! প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় পাওয়া যায় প্রায় ২২৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, যা শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কার্যকর।

এই সময়ে দেশের প্রায় সব ফলের বাজারেই পেয়ারার জয়জয়কার। রাজধানীর কারওয়ান বাজার কিংবা পাড়ার অলিগলির ভ্যানগাড়িতে এখন পেয়ারার প্রাধান্য। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের ভাসমান হাটের নামকরা আপেল পেয়ারা এবং স্বরূপকাঠি পেয়ারা এখন বাজার মাতাচ্ছে। এছাড়া থাই ৮ ও কাজী পেয়ারার মতো জাতগুলোও ভীষণ জনপ্রিয়। মিষ্টি স্বাদ, মুচমুচে আঁশ আর অপূর্ব সুগন্ধের কারণে ক্রেতারা হরদম পেয়ারা কিনছেন। আকারে বড় বা ছোট যাই হোক না কেন, বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি পেয়ারা ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। যেকোনো আমদানি করা দামি আপেলের তুলনায় এই দাম অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
আপেল এবং পেয়ারার তুলনামূলক পুষ্টি মান দেখলে এদের মূল তফাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপেলে পানির পরিমাণ থাকে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এর বিপরীতে পেয়ারায় পানির পরিমাণ থাকে প্রায় ৭০ শতাংশ। পানি বেশি থাকার কারণে পেয়ারা শরীরকে দ্রুত সজীব রাখতে সাহায্য করে। আপেলে বেশ ভালো পরিমাণে ফাইবার এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বয়সজনিত জটিল রোগ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। আপেলে কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট একেবারে নেই বললেই চলে। তবে পেয়ারার পুষ্টি উপাদান অনেক বেশি সমৃদ্ধ। পেয়ারায় ভিটামিন সি-এর পাশাপাশি রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই এবং ভিটামিন কে। ফাইবার ও পানিতে ভরপুর হওয়ায় এটি পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
আপেলের তুলনায় পেয়ারায় চিনির পরিমাণ অনেকটাই কম থাকে। এই কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পেয়ারা অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর একটি ফল। এতে থাকা ডায়েটারি ফাইবার এবং কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিশ্চিন্তে পেয়ারা খেতে পারেন।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পেয়ারা দুর্দান্ত কাজ করে। পেয়ারায় প্রচুর পটাশিয়াম ও ফাইবার থাকে। এই উপাদানগুলো শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে আনে। নিয়মিত পেয়ারা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়। এটি হজমপ্রক্রিয়া সচল রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে সর্দি, কাশি ও নানা ধরণের ভাইরাসের আক্রমণ খুব সাধারণ ঘটনা। পেয়ারায় থাকা প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরকে এসব রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া ত্বকের যত্নেও পেয়ারা দারুণ কার্যকর। এর পানি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে ভেতর থেকে সজীব রাখে এবং বয়সের ছাপ ও বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে।
পেয়ারা কেনার ক্ষেত্রে কিছু সহজ বিষয় মনে রাখা দরকার। খুব বেশি নরম কিংবা গায়ে দাগ থাকা পেয়ারা কেনা উচিত নয়। হালকা সবুজ এবং সামান্য শক্ত পেয়ারা কেনাই সবচেয়ে ভালো। বাজার থেকে ঘরে এনে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে খেয়ে ফেললে এর আসল স্বাদ এবং পুরো পুষ্টি বজায় থাকে। ছোট শিশু কিংবা প্রবীণ মানুষদের বিচিযুক্ত পেয়ারা খেতে খানিকটা সমস্যা হতে পারে। তাদের জন্য পেয়ারার বিচি ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে পরিবেশন করা সবচেয়ে সহজ ও বুদ্ধিমত্তার কাজ।
আপেল নিঃসন্দেহে ভালো ফল। তবে আমাদের দেশি পেয়ারা পুষ্টির দিক থেকে কোনো অংশেই পেছানো নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি আপেলের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর ও উপকারী। দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় এটি সবার হাতের নাগালে থাকে। নিজের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং পরিবারের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি করে দেশি পেয়ারা রাখা অত্যন্ত দরকার।
শাঁওলী সুমন




