
একসময়ের জৌলুস হারিয়ে ঋণের মারাত্মক বোঝা আর আখ সরবরাহের ঘাটতিতে এখন তীব্র সংকটে ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড। ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৭-৭৮ মাড়াই মৌসুমে প্রথম চিনি উৎপাদন শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলার আখচাষিদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মিলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত আট বছর নতুন কোনো ঋণ না নিলেও আগের ঋণের ওপর চক্রবৃদ্ধি সুদে বর্তমানে মোট দেনা দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তার ওপর আখের আবাদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় মিলটির অস্তিত্ব এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

কৃষি সংকটও প্রতিষ্ঠানটির দুশ্চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানসম্পন্ন উচ্চফলনশীল জাতের অভাব এবং অন্যান্য ফসল বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একসময় মিল জোনে ৩৬ হাজার একরের বেশি জমিতে আখ চাষ হলেও তা বর্তমানে কমে মাত্র ১৪ হাজার একরে নেমে এসেছে। অথচ সরকারের নির্দেশে চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষিদের উন্নত মানের বীজ, সার, কীটনাশক, নগদ ঋণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে আখ কিনে দ্রুত মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করে থাকে।

তবে কৃষকদের দাবি ও অভিযোগ ভিন্ন। বাজারে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় আখ চাষে লাভের মুখ দেখা দায় হয়ে পড়েছে। চাষিরা জানান, আখ একটি ১৮ মাসের দীর্ঘমেয়াদী ফসল। একই জমিতে বছরে পেঁয়াজ, রসুন বা ধানের মতো একাধিক ফসল চাষ করে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ আয় করা সম্ভব। এছাড়া সুগার মিল থেকে যে ঋণ বা উপকরণ দেওয়া হয়, তা পরবর্তীতে সুদসহ কেটে নেওয়া হয়। তাই আখের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং সরাসরি সরকারি ভর্তুকি না দিলে এ অঞ্চল থেকে ঐতিহ্যবাহী এই আখের আবাদ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
বর্তমানে চিনি কলটিতে অধিকাংশ জমি প্রান্তিক চাষিদের হাতে চলে যাওয়া এবং কৃষকরা বহুমুখী ফসলের দিকে ঝুঁকায় চাষিদের বাড়তি আর্থিক প্রণোদনা প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করলেও দক্ষ কৃষি বিশেষজ্ঞের অভাবে উৎপাদনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
মিলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন ১ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতাসম্পন্ন এই মিলে প্রতি মৌসুমে ১১০ দিনে ১ লাখ ১০ হাজার টন আখ মাড়াই করা গেলে ৭ হাজার ১৫০ টন চিনি ও ৪ হাজার ১৮০ টন মোলাসেস উৎপাদন সম্ভব। পর্যাপ্ত কাঁচামাল পেলে এবং উৎপাদন বাড়াতে পারলে মিলটিকে লোকসান থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।




